• ঢাকা
  • | বঙ্গাব্দ
ad728

জলাবদ্ধতা, যানজট, কর্মসংস্থান ও নগরায়নের চাপে বদলে যাচ্ছে রংপুর


FavIcon
Rangpur24
নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 1, 2026 | সংবাদটি দেখেছেন : 86
ছবির ক্যাপশন : ad728

মাহফুজ আলম প্রিন্স,রংপুর।। 

রংপুর এখন শুধু একটি বিভাগীয় শহর নয়, উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে নগরায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে শহরটির গুরুত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি সামনে এসেছে নানা সমসাময়িক সমস্যা ও সম্ভাবনার নতুন বাস্তবতা। জলাবদ্ধতা, যানজট, বেকারত্ব, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, পরিবেশ দূষণ এবং আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অভাব বর্তমানে রংপুরের আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম।

রংপুর মহানগরী সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ, নতুন সড়ক এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠলেও সেই অনুপাতে উন্নত হয়নি ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও আবাসিক এলাকা জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে। নগরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি চিহ্নিত হলেও স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

একই সঙ্গে বেড়েছে যানবাহনের চাপ। কয়েক বছর আগেও রংপুর শহরে যানজট ছিল সীমিত। বর্তমানে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সময় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে জাহাজ কোম্পানি মোড়, সিটি বাজার এলাকা, তাজহাট সড়ক এবং মেডিকেল কলেজ সংলগ্ন এলাকায় প্রতিদিনই যানবাহনের ধীরগতি জনভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, জনসংখ্যা ও যানবাহন বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন জরুরি।

রংপুরের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি এখনও কৃষি। ধান, আলু, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদনে জেলার কৃষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তবে কৃষিপণ্যের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে আলু চাষিরা প্রায়ই সংরক্ষণ ব্যয় ও বাজারদরের বৈষম্যের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েন। সম্প্রতি হিমাগার ভাড়া কমানোর দাবিতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আন্দোলন এই সংকটেরই প্রতিফলন। কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারলে কৃষকদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

শিক্ষাক্ষেত্রেও রংপুর নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বিভাগীয় শহর হওয়ায় এখানে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে। তবে গ্রামীণ এলাকার অনেক বিদ্যালয়ে এখনও শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে শহর ও গ্রামের শিক্ষার মানের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তারের পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র হলেও রোগীর চাপ সামলাতে প্রায়ই হিমশিম খেতে হয়। বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিদিন হাজারো মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে শয্যা সংকট, দীর্ঘ অপেক্ষা এবং জনবল ঘাটতির মতো সমস্যা দেখা দেয়। স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসা সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে কেন্দ্রীয় হাসপাতালের ওপর চাপ কমানো সম্ভব হবে।

পরিবেশগত দিক থেকেও রংপুর গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে রয়েছে। শহরের খাল, জলাশয় ও উন্মুক্ত স্থান ধীরে ধীরে দখল ও ভরাটের শিকার হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে প্লাস্টিক বর্জ্য ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি। পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী কয়েক বছরে নগরীর পরিবেশগত ভারসাম্য আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা জলাশয় সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে সম্ভাবনার ক্ষেত্রও কম নয়। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর মেডিকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রংপুরকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ফ্রিল্যান্সিং, অনলাইন ব্যবসা এবং স্টার্টআপ উদ্যোগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে।

পর্যটনের ক্ষেত্রেও রংপুরের সম্ভাবনা রয়েছে। তাজহাট জমিদার বাড়ি, কারমাইকেল কলেজের ঐতিহাসিক স্থাপনা, শেখ রাসেল ইকো পার্ক এবং বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যটকদের আকর্ষণ করে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারণার মাধ্যমে এই খাতকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রংপুরের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা, আধুনিক অবকাঠামো, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগ। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার, প্রশাসন, ব্যবসায়ী সমাজ ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

উত্তরাঞ্চলের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে রংপুর আজ নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সমসাময়িক সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি। পরিকল্পিত উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনসম্পৃক্ত উদ্যোগই পারে আগামী দিনের আধুনিক, বাসযোগ্য ও সমৃদ্ধ রংপুর গড়ে তুলতে।

...